আর্কটিকের বিপর্যয়ে সংকটে পৃথিবী, বাড়বে প্রাকৃতিক দুর্যোগ

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস, ‘২০৫০ সালের মধ্যে গ্রীষ্মকালে আর্কটিক সম্পূর্ণ বরফমুক্ত হয়ে যেতে পারে—এমনকি যদি আজই কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়া হয় তবুও।’

বরফে ঢাকা নিস্তব্ধতা, রহস্যময় নীলাভ আলো আর প্রকৃতির সৌন্দর্য—আর্কটিক অঞ্চল যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে জাগিয়েছে বিস্ময়। আজ সেই আর্কটিকই হয়ে উঠেছে পৃথিবীর জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তার উৎস। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বরফের চাদর গলে যাওয়া, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে যাওয়া বাস্তুতন্ত্র—এসবই এখন আর্কটিকের প্রতিচ্ছবি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলস্বরূপ আর্কটিক প্রবেশ করেছে এক ‘নতুন যুগে’। যেখানে বরফের পরিমাণ, সমুদ্রের তাপমাত্রা, এবং বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনগুলো অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে। এর ফলে আবহাওয়া আরো চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠবে, বাড়বে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে আর্কটিকের কিছু অংশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। শীতের মাঝামাঝি সময়ে এমন তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারে বিজ্ঞানীরা বিস্মিত। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)-এর ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই দশক ধরে আর্কটিকের বরফ গলার হার এতটাই তীব্র যে এটি এখন ‘নতুন দশায়’ প্রবেশ করেছে। বরফের পরিমাণ ফেব্রুয়ারি মাসে ইতিহাসের সর্বনিম্নে পৌঁছেছে, যা টানা তৃতীয় মাসের মতো রেকর্ড ভাঙার ধারাবাহিকতা।

ফিনল্যান্ডের মেটেরিওলজিকাল ইনস্টিটিউটের গবেষক মিকা র্যান্টানেনের ভাষ্য, গ্রীষ্মে বরফ গলার মৌসুম শুরুর আগেই এই অবস্থা উদ্বেগজনক। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস, ‘২০৫০ সালের মধ্যে গ্রীষ্মকালে আর্কটিক সম্পূর্ণ বরফমুক্ত হয়ে যেতে পারে—এমনকি যদি আজই কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়া হয় তবুও।’ হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবরফ বিশেষজ্ঞ ডির্ক নোটজের মতে, ‘এটাকে এখন আর রোধ করা সম্ভব নয়।’

আর্কটিকের বরফ শুধু স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য নয়, গোটা পৃথিবীর জলবায়ুর জন্য অপরিহার্য। আর্কটিক অঞ্চলটি পৃথিবীর তাপমাত্রা ও আবহাওয়া ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি পৃথিবীর ‘এয়ার কন্ডিশনার’ হিসেবে কাজ করে। সাদা বরফ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে ঠান্ডা রাখে। আর্কটিকে বরফের এই দ্রুত অবক্ষয় বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করবে। এর ফলে সাগরের পানির স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। আবহাওয়া আরো চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠবে, বাড়বে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আর্কটিকের এই পরিবর্তন একটি সতর্ক সংকেত। ২০৫০ সালের মধ্যে, আর্কটিকের গ্রীষ্মে বরফহীন দিন আসবে। এমনকি মানবজাতি যদি তাদের কার্বন নিঃসরণ বন্ধও করে দেয় তাও এই পরিস্থিতি ঠেকানো প্রায় অসম্ভব।

এছাড়া, আর্কটিকের দ্রুত উষ্ণায়ন বায়ুর প্রবাহ (জেট স্ট্রিম) দুর্বল করে দিচ্ছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধারা বদলে যাচ্ছে। উডওয়েল ক্লাইমেট রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানী জেনিফার ফ্রান্সিস ব্যাখ্যা করেন, ‘জেট স্ট্রিমের গতিপথ অনিয়মিত হলে তাপপ্রবাহ, খরা, বা বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। যেমন—২০২২ সালের পাকিস্তানের ভয়াবহ বন্যা বা ইউরোপের দাবদাহ এই পরিবর্তনেরই ফল।’

আর্কটিকের এই সংকট বোঝার জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা অপরিহার্য। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, যা আর্কটিক মনিটরিংকে ব্যাহত করছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন জলবায়ু অর্থায়ন একবারে কমিয়ে দিয়েছে। ডির্ক নোটজের ভাষায়, ‘এই মুহূর্তে আর্কটিকের তথ্য সংগ্রহ কমে গেলে ভবিষ্যতের জন্য আমরা অন্ধ হয়ে যাব।’

তবে বিজ্ঞানীরা শোনাচ্ছেন আশার কথাও। তারা বলছেন, মানুষ জলবায়ুর বিষয়ে সংবেদনশীল ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হয় তবে অবস্থার উন্নতি হতে পারে। তারা বলছেন, আর্কটিকের বরফ যেভাবে গলে সমুদ্রে মিশছে, তেমনি গলতে হবে রাজনৈতিক অনড়তা। বৈশ্বিক সহযোগিতা, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ, এবং বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিই কেবল এই অঞ্চল ও পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

আরও